একসময় নিজের রান্নার হাতের ওপর ভর করেই চলতেন নার্গিস আক্তার লিজ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রাঁধুনির কাজ করে যে আয় করতেন, তা দিয়েই চলত তাঁর জীবন। কিন্তু প্রায় নয় মাস আগে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কেড়ে নেয় তাঁর একটি পা। এরপর একে একে বন্ধ হয়ে যায় কাজ, আয় ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ। স্বামী নেই, সন্তানও নেই। উত্তর বাড্ডার একটি ঘরে অনেকটা একাকী জীবন কাটছিল তাঁর।
এমন পরিস্থিতিতে নার্গিসের পাশে দাঁড়িয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তাঁর হাতে একটি হুইলচেয়ার ও আর্থিক অনুদান তুলে দেওয়া হয়। তাঁর অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে এই মানবিক উদ্যোগ নেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
নার্গিসের জীবন সবসময় এমন ছিল না। কর্মক্ষম থাকাকালে নিজের শ্রমেই জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। কিন্তু ডায়াবেটিসের জটিলতায় প্রায় নয় মাস আগে তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর বদলে যায় তাঁর জীবন। হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে হারাতে হয় কর্মসংস্থানের সুযোগও।
এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক লড়াই। চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মতো নিয়মিত কোনো আয় নেই। পাশে থাকার মতো পরিবারের সদস্যও নেই। উত্তর বাড্ডার একটি ঘরে অনেকটা নিঃসঙ্গভাবেই দিন কাটছিল তাঁর।
নার্গিসের পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম দ্রুত সহায়তার উদ্যোগ নেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রশাসনের মানবিক দায়িত্ব। নার্গিসকে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলাই লক্ষ্য। তাঁর নিজের আয় ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
এর অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নার্গিসকে একটি হুইলচেয়ার ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এতে তাঁর দৈনন্দিন চলাফেরা ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা স্বস্তি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এখানেই থেমে থাকছে না জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ। নার্গিস যেন শুধু অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই তাঁর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মুদি দোকান প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
একটি মুদি দোকান হয়তো অনেকের কাছে খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু নার্গিসের মতো একজন মানুষের জন্য এটি নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ। নিয়মিত আয়ের পথ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নিজের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকারও একটি অবলম্বন হতে পারে এটি।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে নতুন করে আশার আলো দেখছেন নার্গিস। একসময় নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করা এই নারী শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে থমকে যাওয়া জীবন আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।
মানবিক সহায়তার পাশাপাশি একজন অসহায় মানুষকে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি হুইলচেয়ার বা আর্থিক অনুদান দেওয়ার ঘটনা নয়। এটি একজন মানুষকে নতুন করে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়ারও একটি উদ্যোগ।