মবিনুল ইসলাম রাশা,গবি:
ময়মনসিংহের মাঠে ক্রিকেট খেলে বেড়ে ওঠা এক তরুণের প্রযুক্তির প্রতি কৌতূহল তাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেছে চিকিৎসাপ্রযুক্তির একেবারে নতুন জগতে। সেই তরুণ গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগে পড়াশোনা করে পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথম রোবোটিক সার্জারিতে অ্যাপ্লিকেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নাম শাহীনুর আলম সীমান্ত।
ময়মনসিংহের মাঠ থেকে প্রযুক্তির জগতে
ময়মনসিংহ শহরের কাটাতারের ফাঁক গলে আসা বিকেলের রোদ আর বিভাগীয় স্টেডিয়ামের লাল মাটির গন্ধে কেটেছে সীমান্তের শৈশব ও কৈশোর। সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠায় জীবনে বিলাসিতা ছিল না। তবে স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না।
তার বাবা-মা এখন আর বেঁচে নেই। অভাবের সঙ্গে লড়াই করে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে মূল্যবোধ তারা শিখিয়েছিলেন, সেটিই সীমান্তের পথচলায় বড় প্রেরণা হয়ে আছে।
ছোটবেলায় ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। বিসিবি ইয়ং টাইগার্স ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ব্যাট-বলের লড়াইয়ে সময় কাটত। তবে ক্রিকেটের পাশাপাশি প্রযুক্তির প্রতিও তৈরি হয়েছিল আলাদা কৌতূহল।
গোধূলির আলো ফুরিয়ে এলে দাদার পাশে বসে টেলিভিশনে ডিসকভারি চ্যানেল দেখতেন তিনি। জটিল সব যন্ত্রের কার্যপ্রণালি এবং মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা তাকে মুগ্ধ করত। তখন অবশ্য জানা ছিল না, এই কৌতূহল একদিন তাকে দেশের চিকিৎসাপ্রযুক্তির নতুন একটি অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করবে।
ময়মনসিংহ ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয় ও নটরডেম কলেজের পড়াশোনা শেষে সীমান্ত ভর্তি হন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত খুব বেশি পরিকল্পিত ছিল না। তুলনামূলক কম খরচে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগে প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমন্বয়ে পড়ার সুযোগ তাকে আকৃষ্ট করেছিল।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ, মাঠের ক্রিকেট-ফুটবল এবং বন্ধুদের আড্ডা তার কাছে হয়ে ওঠে স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সীমান্তের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শুধু একটি ডিগ্রি দেয়নি। দিয়েছে পেশাগত জীবনের ভিত্তি এবং একঝাঁক শুভাকাঙ্ক্ষী।
থিসিস থেকে চিকিৎসাযন্ত্রের প্রতি আগ্রহ
স্নাতকের শেষ সেমিস্টারে থিসিস করতে গিয়ে চিকিৎসাযন্ত্রের প্রতি তার আগ্রহ আরও গভীর হয়। শিক্ষক ড. স্বপন কুমারের তত্ত্বাবধানে ‘বাবল সি-প্যাপ’ নিয়ে কাজ করার সময় যন্ত্রের গঠন ও চিকিৎসাক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পান তিনি।
শিক্ষকের একটি পরামর্শ তার শেখার ধরনেও প্রভাব ফেলে। শুধু লেকচার বা বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গুগল স্কলারে গবেষণাপত্র পড়ার ওপর জোর দিতেন ড. স্বপন কুমার।
বন্ধু আকাশ ও শাহাবুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসাযন্ত্রের প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করতেন সীমান্ত। শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে এসব আলোচনা এবং গবেষণাপত্র পড়ার অভ্যাসই নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার আগ্রহকে আরও স্থায়ী করে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণার পরিবেশই তার পেশাগত জীবনের পরবর্তী পথচলার ভিত্তি তৈরি করে।
রোবোটিক সার্জারির পথে
কর্মজীবনের শুরুতে ডায়ালাইসিস যন্ত্রসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসরঞ্জাম নিয়ে কাজ করেন সীমান্ত। প্রযুক্তি শেখার প্রতি তার আগ্রহ ও কাজের ধরন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের নজরে আসে। পরে তাকে ল্যাপারোস্কোপিক ও রোবোটিক সার্জারির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেখান থেকেই তার কর্মজীবনে আসে বড় পরিবর্তন।
বাংলাদেশে তখন প্রথমবারের মতো একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল সিস্টেম আসছিল। নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় দেশে এর আগে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ ছিল না। সেই পরিস্থিতিতে সীমান্ত মূল অ্যাপ্লিকেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
প্রশিক্ষণের আগে নিজেকে তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করতে ক্যাটালগ, ইউটিউব ভিডিও এবং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ক্লাসের সহায়তা নেন তিনি। পরে চীনে গিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করেন ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশের প্রথম সফল রোবোটিক সার্জারিতে অংশ নেন তিনি ৩১ আগস্ট,২০২৬ সালে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে। সে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তার জন্য ছিল আনন্দের পাশাপাশি বড় দায়িত্বেরও। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবার একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হচ্ছিল। সেই কারণে প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়েছে তাকে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে সীমান্ত সেদিন দেশের রোবোটিক সার্জারির শুরুর পর্যায়ে অ্যাপ্লিকেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শুধু যন্ত্র আনলেই হবে না
রোবোটিক সার্জারির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র দেশে আনা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সীমান্ত। এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ সার্জন, প্রশিক্ষিত অ্যাপ্লিকেশন বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার সমন্বয়।
তার মতে, রোবোটিক সার্জারির মতো প্রযুক্তি যেন শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় টেকসইভাবে কাজে আসে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তরুণদের জন্য তার পরামর্শ, নিজেদের কোনো একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন বিষয় শেখার চেষ্টা করা। কোনো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে ওঠার আগে অনেকবার নতুন করে শেখার পর্যায়ে যেতে হয়—এ কথাই তরুণদের মনে রাখতে বলেন তিনি।
জীবনের কঠিন সময়েও হাল ছাড়েননি সীমান্ত। দেশের প্রথম রোবোটিক সার্জারিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবেও দেখতে চান না। বরং সামনে আরও উন্নত কিছু প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তার, যেগুলো এখনো দেশে আসেনি।
দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত করে মানুষের প্রকৃত উপকারে আসতে পারার দিনটিকেই নিজের সার্থকতার দিন হিসেবে দেখতে চান গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক শিক্ষার্থী।