সামিহা সিরাজী লাজ :
মানুষের জীবনের প্রথম বিদ্যালয় কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, একটি ঘর। আর সেই ঘরের প্রথম শিক্ষক—মা। তাঁর কাছেই শুরু হয় অক্ষর চেনার আগের সেই শিক্ষা, যা ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে ওঠার ভিত গড়ে দেয়।
মানুষের জীবনে প্রথম বিদ্যালয়ের নাম হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; সেটি একটি ঘর। আর সেই ঘরের প্রথম শিক্ষক—মা। পৃথিবীর আলো দেখার পর যে মানুষটির মুখ আমরা প্রথম দেখি, যে কণ্ঠস্বর আমাদের প্রথম আশ্বস্ত করে, যে হাত ধরে আমরা প্রথম হাঁটতে শিখি তিনি শুধু আমাদের জন্মদাত্রী নন, তিনি আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষক।
পৃথিবীর আলো দেখার পর যে মুখটি আমরা প্রথম দেখি, যে কণ্ঠস্বরটি আমাদের অস্থিরতা থামায়, যে হাতটি ধরে আমরা প্রথম হাঁটতে শিখি সেই মানুষটিই ধীরে ধীরে আমাদের পৃথিবী চিনতে শেখান। মা শুধু আমাদের জন্ম দেন না; তিনি আমাদের চিন্তা করতে শেখান, অনুভব করতে শেখান, ভুল করতে শেখান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুলের পর আবার উঠে দাঁড়াতে শেখান।
বর্ণমালার আগেই শুরু হয় যে শিক্ষা
শিক্ষার শুরু আসলে বর্ণমালা দিয়ে নয়, শুরু হয় মায়ের স্পর্শ দিয়ে। মা-ই প্রথম শিখিয়েছিল কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে হাসতে হয়, কীভাবে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। ‘অ’, ‘আ’, ‘ক’, ‘খ’ শেখার অনেক আগেই মা আমাকে শিখিয়েছিলো ভালোবাসার ভাষা, মমতার অর্থ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। তাঁর ছোট ছোট কথার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের বড় বড় শিক্ষা।
ভুল থেকে উঠে দাঁড়ানোর পাঠ
একটি শিশু যখন প্রথমবার ভুল করে, মা তখন শুধু তাকে বকেন না; ভুল থেকে কীভাবে শিখতে হয়, সেটিও শেখান। যখন সে ব্যর্থ হয়, মা তাকে বোঝান ব্যর্থতা শেষ নয়। যখন সে ভয় পায়, মায়ের একটি আশ্বাস তাকে সাহসী করে তোলে। তাই মায়ের দেওয়া শিক্ষা কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে থাকে প্রতিদিনের জীবনযাপনে।
যে পাঠশালার নেই কোনো ছুটি
বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাদের জ্ঞান দেন, পৃথিবীকে চিনতে শেখান। কিন্তু সেই জ্ঞান গ্রহণের ভিত্তিটুকু তৈরি করে দেন মা। একজন শিক্ষক হয়তো নির্দিষ্ট সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন; মা সেখানে কোনো ঘণ্টার অপেক্ষা করেন না। তাঁর পাঠশালার সময়সীমা নেই, ছুটিও নেই। তাঁর শিক্ষা চলে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে খাবার টেবিলে, ঘুম পাড়ানোর সময়, অসুস্থতার রাতে, কিংবা আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে।
মানুষ হওয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা
মায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত মানুষ হওয়ার শিক্ষা। তিনি শেখান অন্যের কষ্ট বুঝতে, ছোটকে ভালোবাসতে, বড়কে সম্মান করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং নিজের ভুল স্বীকার করতে। অনেক সময় মা কোনো বই খুলে নৈতিকতার সংজ্ঞা পড়ান না; তাঁর নিজের জীবনই হয়ে ওঠে সেই নৈতিকতার জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর ত্যাগ, ধৈর্য, সংগ্রাম এবং নিঃশর্ত ভালোবাসা সন্তানের সামনে জীবনের এক অনন্য পাঠ হয়ে থাকে।
তথ্যের ভিড়ে শিক্ষার আসল অর্থ
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে শিক্ষার সংজ্ঞাও বদলেছে। প্রযুক্তি আমাদের অসংখ্য তথ্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক নয়। তথ্য আমাদের জানায়, আর শিক্ষা আমাদের মানুষ করে। সেই মানুষ হয়ে ওঠার প্রথম যাত্রাটি শুরু হয় মায়ের কাছ থেকেই।
শিক্ষক দিবসে প্রথম শিক্ষকের কথা
তাই শিক্ষক দিবসে যখন আমরা আমাদের প্রিয় শিক্ষকদের শ্রদ্ধা জানাই, তখন শ্রদ্ধার তালিকার প্রথম সারিতে থাকা উচিত সেই মানুষটির নাম যিনি আমাদের প্রথম শব্দ শিখিয়েছেন, প্রথম স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ হতে শিখিয়েছেন।
মা হয়তো কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, তাঁর হাতে হয়তো চক-ডাস্টার নেই, কোনো শ্রেণিকক্ষও নেই। তবু সন্তানের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে ভালোবাসায় লেখা পাঠটি তিনিই পড়ান।
মা—আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম পাঠশালা এবং সারাজীবনের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষা।