অজানাকে জয় করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই মানুষ আদিম যুগ থেকে আজকের এএই যুগে উপনীত হয়েছে । অজানাকে জানার অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ভ্রমণ বা আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে “পর্যটন “। বর্তমানে পর্যটন বিশ্ব অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক শক্তিশালী মাধ্যম।এটি প্রতিটি অনুসন্ধিৎসু মানুষকে নিয়ে আসে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও অচেনা জীবনের কাছাকাছি ।নিজেকে জানার পাশাপাশি ,আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের মাধ্যমে,বিশ্বকে জানার ও বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় এই পর্যটন। সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই মানুষ ভ্রমণের সাথে যুক্ত।এটা মানুষের বহু শতাব্দীর পুরনো এক ভাললাগা ।কিন্তু সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে আজকের এই আধুনিক পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস।
আবার এই পর্যটন কেবল আত্মবিনোদন বা অবসরযাপনের মাধ্যম নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ চালিকাশক্তিও বটে । জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের স্বাভাবিক পরিবেশের বাইরে টানা এক বছরের কম সময় ধরে বিনোদন, ব্যবসা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যাতায়াত ও অবস্থান করেন, তবে তাকে পর্যটন বলা হয়। তবে যুগে যুগে কালে কালে এর রকম,ধরন ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ধরা দিয়েছে ; মানুষের ভ্রমণের ইতিহাস সভ্যতার মতোই প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০-১৫০০ অব্দে সুমেরীয় সভ্যতায় চাকা ও মুদ্রাব্যবস্থার উদ্ভাবন বাণিজ্য ও ভ্রমণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রাচীন মিসরে ফারাওদের আমলে ধর্মীয় উৎসব ও পিরামিড দর্শনে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের আগমন ঘটেছিল, যা পর্যটনের আদি রূপ।
পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে অলিম্পিক গেমসকে কেন্দ্র করে গ্রিসে পর্যটন-বাণিজ্যের ব্যাপক পসরা বসে ।যার মাত্রা দিনকে দিন কেবলই বাড়ছে ।অপরদিকে সুসংগঠিত রাস্তাঘাট ও সুপেয় পানির বন্দোবস্তকে কেন্দ্র করে রোমান সাম্রাজ্যে পর্যটন ও আতিথেয়তা সংস্কৃতির প্রভূত বিকাশ ঘটে।
মধ্যযুগে (৫০০–১৫০০ খ্রিস্টাব্দ) বাণিজ্য ও ধর্মীয় তীর্থযাত্রা ছিল ভ্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি। এশিয়ায় 'সিল্ক রোড' ধরে ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের পদচারণা বাড়ে। এ যুগেই ইবনে বতুতা, মার্কো পোলো এবং হিউয়েন সাঙের মতো প্রখ্যাত পরিব্রাজকরা বিশ্ব পরিভ্রমণ করে ইতিহাস সমৃদ্ধ করেন।
১৭-১৮ শতকে ইউরোপে অভিজাতদের শিক্ষার অংশ হিসেবে 'গ্র্যান্ড ট্যুর' প্রথা চালু হয়। তবে ১৮৪১ সালে থমাস কুক কর্তৃক সংগঠিত প্রথম প্যাকেজ ট্রেন ট্যুরের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যটন যুগে প্রবেশ করে।সে বছর তার উদ্যোগে ইংল্যান্ডে ৫৭০ জন যাত্রীর বাণিজ্যিক ট্রেন ভ্রমণই বিশ্বজুড়ে আধুনিক ও সংগঠিত পর্যটনের সূচনা করে।তাই তাঁকে আধুনিক পর্যটনের জনকও বলা হয়ে থাকে ।
ইসলামিক ঐতিহ্য ও হজকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা
ইসলামিক সভ্যতায় ভ্রমণকে জ্ঞানার্জন, বাণিজ্য ও পুণ্য অর্জনের সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা হতো। মধ্যযুগে হজের উদ্দেশ্যে সুদূর আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপ থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা আসত, যাদের নিরাপত্তায় 'মহমিল' বা সুরক্ষিত কাফেলা গঠন করা হতো। ভ্রমণকারীদের বিশ্রামের জন্য বৈশ্বিক বাণিজ্য ও হজের পথে গড়ে উঠেছিল সরাইখানা। কিন্তু পবিত্র হজকে বাণিজ্যিক পর্যটনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়; এটি ইসলামের একটি ধর্মীয় ইবাদত। তবে হজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পরিবহন, আবাসন, খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খুচরা ব্যবসা ও অন্যান্য সেবাখাতের অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত বড়। তাই হজ কেবল ধর্মীয় আচারই না, বরং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিনিময়ের মিলনমেলা।
সৌদি অর্থনীতিতে এর প্রভাবও সুস্পষ্ট। ২০২৫ সালে হজে মোট ১৬ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। তাঁদের সেবা দিতে ৪ লাখ ২০ হাজারের বেশি কর্মী যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ একটি ধর্মীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে কীভাবে বিশাল পরিসরের পরিবহন, আবাসন, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সেবা-অর্থনীতি তৈরি হতে পারে—হজ তার একটি অনন্য উদাহরণ।
বাংলাদেশে পর্যটনের সূচনা ও বিস্তার
বাংলাদেশের পর্যটনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। উর্বর ভূমি ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যের কারণে প্রাচীন বাংলা পরিব্রাজকদের প্রিয় স্থান ছিল। বাংলার জনপদ, বন্দর, বৌদ্ধবিহার, মসজিদ, মন্দির ও জমিদারবাড়ি এই ভূখণ্ডের সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি—এসব শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়; এগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। হিউয়েন সাঙ ও ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তেও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদসমূহকে মোটাদাগে তিন ধরনের বিভাজন করা যায় —
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থান সমূহ : কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, রাতারগুল, টাঙ্গুয়ার হাওর, সিলেটের চা-বাগান।
পাহাড় ও ট্রেইল কেন্দ্রিক : বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক: পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পানাম নগর, বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, উত্তরা গণভবনসহ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা। এছাড়াও ভাসমান পেয়ার বাজার,নৌকার বাজার,কাঠের বাজার,লালশাপলা প্রভৃতি ছাড়াও নানা লক ওয়াটার ট্যুরিজম রয়েছে । এগুলি ছাড়াও সারাদেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মণ্ডিত স্থান, নিদর্শন।তথাপি আমাদের পর্যটনের কাঙ্খিত উন্নয়ন অদ্যাবধি আশানুরূপ পর্যায়ে উপনীত হয়নি ।কিন্তু এই সমস্যা সম্পদের অভাবে নয়; বরং সমস্যা হলো এসব সম্পদকে পর্যটন-পণ্যে রূপান্তরের ঘাটতি। এক্ষেত্রে সদিচ্ছা,সক্ষমতা,পরিকল্পনা,প্রযুক্তি,উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি ।
ছোট দেশ মালদ্বীপ ,প্রবাল প্রাচীর ও বিলাসবহুল ওয়াটার ভিলার সমন্বয়ে, "এক দ্বীপ, এক রিসোর্ট" নীতি প্রয়োগ করে তাদের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ পর্যটন থেকেই আয় করছে। থাইল্যান্ড তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, পাতায়া-ফুকেটের নৈসর্গিক সৈকত ও ঐতিহাসিক মন্দিরের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জিডিপির প্রায় ১০-১২ শতাংশ পর্যটন থেকে অর্জন করে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক রূপের অভাব থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর কেবল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চাঙ্গি বা মেরিনা বে-র মতো কৃত্রিম স্থাপনা দিয়ে পর্যটন খাতকে দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তর করেছে।
বিপরীতে, বিশ্বসেরা প্রাকৃতিক সম্পদ—দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবন বা বান্দরবান থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানের সেবার অভাব ও সঠিক ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতিতে আমাদের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি। তাই সার্বিক বিবেচনায় পর্যটন খাতের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের এখনই সময় । পর্যটন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বাংলাদেশকে থাইল্যান্ডের মতো সহজ অন-অ্যারাইভাল ভিসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, মালদ্বীপের মতো পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম এবং সিঙ্গাপুরের মতো আন্তর্জাতিক বিপণন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় দেশের পর্যটন খাতকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে নানামুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে দেশের ১,৪৯৮টি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে 'জাতীয় পর্যটন মাস্টার প্ল্যান' চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে পর্যটনের উন্নয়নে নতুন করে শত শত প্রকল্প নেওয়ার চেয়ে বিদ্যমান সম্পদকে কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করা অধিক জরুরি।
পাশাপাশি টেকসই পর্যটন প্রসারে নতুন 'জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬' প্রবর্তনের কাজ চলছে।
ডিজিটাল পরিসরে "Beautiful Bangladesh" প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রচারণার পাশাপাশি ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নিরূপণে 'ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট' (TSA) চালুর প্রক্রিয়াও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বাংলাদেশে পর্যটন খাত বর্তমানে GDP-এর প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। সরকার আগামী দিনে এই অবদান ৭–৮শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাজারের সম্ভাবনা
পর্যটন একটি অত্যন্ত শ্রমঘন (Labor-intensive) খাত যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, এভিয়েশন, ট্রাভেল এজেন্সি ও গাইডশিপে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এটি কৃষি, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনে ব্যাপক পরোক্ষ অবদান রাখে।তাই সুকপরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ব্লু-ইকোনমি, পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট, এআই (AI) ভিত্তিক স্মার্ট ট্যুরিজম এবং আন্তর্জাতিক ক্রুজ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া তথা সারাবিশ্বে অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন হাবে পরিণত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে ।
বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশকে সফল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে অন-অ্যারাইভাল ভিসার পরিধি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিনের মতো স্থানে বিদেশি পর্যটকদের রুচি ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন (ETZ) প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।
একইভাবে বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ক্রুজ শিপ চালু এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব ওয়াটার-ট্যুরিজম গড়ে তুলে ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে বিবিসি বা সিএনএনের মতো শীর্ষ মাধ্যমে জোরালো ব্র্যান্ডিং ও প্রচার চালানো খুবই জরুরি ।হসপিটালিটি তথা আতিথেয়তা খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে দক্ষ গাইড ও কর্মী তৈরি করার পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চল ও সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় ধারণক্ষমতা (Carrying Capacity) বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে।
আরও খোলাখুলিভাবে বলতে গেলে,কক্সবাজারকে শুধু সমুদ্রসৈকত হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দেখতে হবে। সুন্দরবনকে শুধু বন নয়, পরিবেশবান্ধব অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। পাহাড়কে শুধু দৃশ্য নয়, সংস্কৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানকে শুধু পুরোনো স্থাপনা না রেখে গল্প, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।
সেকালে মানুষ পথ চিনত নক্ষত্র দেখে। একালে স্মার্টফোন পথ দেখায়। আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো পুরো ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাই পাল্টে দেবে।সেই প্রস্তুতিও থাকতে হবে । বাংলাদেশের সামনে তাই সুযোগ একটাই—পর্যটনকে শুধু ‘স্পট উন্নয়ন’ থেকে বের করে একটি সমন্বিত শিল্পে পরিণত করা। প্রকৃতি বাংলাদেশকে দুহাত ভরে দিয়েছে। ইতিহাসও দিয়েছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা।তবেই পর্যটন হবে শুধু অবকাশযাপনের মাধ্যম নয়—বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক পরিচয়ের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। তাই সুকপরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ব্লু-ইকোনমি, পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্ট, এআই (AI) ভিত্তিক স্মার্ট ট্যুরিজম এবং আন্তর্জাতিক ক্রুজ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া তথা সারাবিশ্বে অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন হাবে পরিণত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে ।
বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশকে সফল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে অন-অ্যারাইভাল ভিসার পরিধি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিনের মতো স্থানে বিদেশি পর্যটকদের রুচি ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন (ETZ) প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।
একইভাবে বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ক্রুজ শিপ চালু এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব ওয়াটার-ট্যুরিজম গড়ে তুলে ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে বিবিসি বা সিএনএনের মতো শীর্ষ মাধ্যমে জোরালো ব্র্যান্ডিং ও প্রচার চালানো খুবই জরুরি ।হসপিটালিটি তথা আতিথেয়তা খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে দক্ষ গাইড ও কর্মী তৈরি করার পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চল ও সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় ধারণক্ষমতা বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে। আরও খোলাখুলিভাবে বলতে গেলে,কক্সবাজারকে শুধু সমুদ্রসৈকত হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দেখতে হবে। সুন্দরবনকে শুধু বন নয়, পরিবেশবান্ধব অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। পাহাড়কে শুধু দৃশ্য নয়, সংস্কৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানকে শুধু পুরোনো স্থাপনা না রেখে গল্প, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।
সেকালে মানুষ পথ চিনত নক্ষত্র দেখে। একালে স্মার্টফোন পথ দেখায়। আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো পুরো ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাই পাল্টে দেবে।সেই প্রস্তুতিও থাকতে হবে । বাংলাদেশের সামনে তাই সুযোগ একটাই—পর্যটনকে শুধু ‘স্পট উন্নয়ন’ থেকে বের করে একটি সমন্বিত শিল্পে পরিণত করা। প্রকৃতি বাংলাদেশকে দুহাত ভরে দিয়েছে। ইতিহাসও দিয়েছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা।তবেই পর্যটন হবে শুধু অবকাশযাপনের মাধ্যম নয়—বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক পরিচয়ের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ।
-মাহবুব রুমন
লেখক- কলামিস্ট ও সিনিয়র সহকারী সচিব