বাংলাদেশ প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে, যা মানবিকতার পরিচয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন এবং কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ইইউ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ (এফইএস) বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ সিরিজের তৃতীয় পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-ইউরোপ সম্পর্ক, একাডেমিক সহযোগিতা, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুঙ বাংলাদেশের রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফেলিক্স গ্রেদেস সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সংহতির প্রতি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯২৫ সালে শ্রম অধিকারকেন্দ্রিক একটি শিক্ষামূলক সহায়তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করা এফইএস গত এক শতকে সংলাপ, গবেষণা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
ড. গ্রেদেস বলেন, ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’-এর মতো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং অর্থবহ মতবিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ন্যায়বিচারে সীমিত প্রবেশাধিকার ও জলবায়ু পরিবর্তনকে তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জ্ঞান স্থানান্তরের জায়গা নয়; বরং এটি এমন একটি স্থান, যেখানে চিন্তাকে প্রশ্ন করা হয়, দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত হয় এবং তরুণরা একটি আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বকে বোঝার সুযোগ পায়।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে কূটনীতি শুধু সরকারি দপ্তর, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বন্ধ দরজার আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো কূটনৈতিক আলোচনায় উঠে এলেও এগুলো সরাসরি তরুণদের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার, প্রশ্ন করার, মতবিনিময় করার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গঠনে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’-এর মতো আয়োজন শিক্ষার্থী ও কূটনীতিকদের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের সুযোগ তৈরি করে, যা বৈশ্বিক বিষয় সম্পর্কে সচেতনতা ও বোঝাপড়া বাড়ায়।
উপাচার্য আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের আয়োজন শুধু রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য শোনার সুযোগ নয়; বরং এটি অর্থবহ আলোচনায় অংশগ্রহণ, মতামত বিনিময় এবং বৈশ্বিক আলোচনায় নিজেদের অবদান রাখার একটি সুযোগ। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ উদ্যোগের মূল দর্শন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণত কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে সমাজের বিশেষ শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে; এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো কূটনৈতিক প্রতিনিধি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব কমানো।
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ সিরিজের উদ্দেশ্য হলো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও বন্ধ দরজার বৈঠকের বাইরে কূটনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে অর্থবহ আলোচনার সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার সিজিএস ও এফইএস বাংলাদেশকে আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগকে স্বাগত জানান। ইউরোপীয় ইউনিয়নে তিন দশকের কর্মঅভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করা জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, চলমান সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সংলাপ প্রয়োজন। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির কথা স্বীকার করে তিনি সম্মিলিত উদ্যোগ ও টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মাইকেল মিলার বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং একটি উন্মুক্ত নাগরিক পরিসর তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য আইনের শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, আইনের শাসন আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই অংশীদারিত্ব আরও কৌশলগত ও রাজনৈতিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, টেকসই সম্পর্ক নির্ভরতা নয়, বরং সহযোগিতা, জোট ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বাণিজ্য, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ন্যায্য ও উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে মাইকেল মিলার বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি সুষ্ঠু বাণিজ্য পরিবেশ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা বৃদ্ধির আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত মিলার বলেন, বাংলাদেশ প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তার কথা উল্লেখ করে সংকটটির টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রূপান্তর প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সবুজ রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের একটি পরিবর্তনকালীন সময়ে নিজের আগমনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, যেকোনো রূপান্তর ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সময় ও প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা প্রকাশ করে বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে অব্যাহত সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাণিজ্য, জলবায়ু কার্যক্রম, অভিবাসন, শিক্ষা, বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়।
কেএমএম