একটি নিজের ঘর, নিরাপদ ঠিকানা আর সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ—এই স্বপ্ন নিয়েই ধামরাইয়ের রূপনগর বেদে পল্লীর অনেক পরিবারের কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। কখনো নৌকায়, কখনো অন্যের জায়গায় বসতি গড়ে চলেছে তাদের জীবন। এবার সেই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্থায়ী ঠিকানা ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন পল্লীর বাসিন্দারা।
স্থায়ী আবাসনের জন্য খাসজমি বরাদ্দের পাশাপাশি পল্লীর ২৫ নারীর হাতে সেলাই মেশিন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৫ লাখ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব সহায়তা হস্তান্তর করেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম।
ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের রূপনগর এলাকায় প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। দীর্ঘ সময়েও অধিকাংশ পরিবারের হয়নি নিজস্ব জমি বা স্থায়ী আবাসন। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় নৌকাই ছিল তাদের ঘর। পরে স্থলভাগে বসতি গড়লেও তা ছিল অন্যের জায়গায়। ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও ছিল না স্থায়ীভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পল্লীর বাসিন্দাদের স্থায়ী আবাসনের জন্য খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের নারীদের আয়মূলক কাজে যুক্ত করে স্বাবলম্বী করতে ২৫ জন নারীকে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের ‘হ্যালো ডিসি’ কার্যক্রমের মাধ্যমে সেলাই মেশিনের জন্য আবেদন করেছিলেন পল্লীর নারীরা। আবেদনে সাড়া দিয়ে তাদের হাতে এসব মেশিন তুলে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি পরিবারগুলোর আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া পল্লীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে উপজেলা পরিষদের বিশেষ তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের চেক দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, “পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রাখা যাবে না। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষও এই সমাজেরই অংশ। তাদের স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে আমরা কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষকে শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, এমন সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন বদলাতে পারেন। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেদে পল্লীর নারীরা স্বাবলম্বী হবেন এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে শক্তিশালী হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
এর আগে গত ২০ আগস্ট রূপনগর বেদে পল্লী সরেজমিনে পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। পল্লীর বাসিন্দাদের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৩০ বছর পর কোনো জেলা প্রশাসকের এটি ছিল ওই এলাকায় প্রথম সরেজমিন পরিদর্শন।
পরিদর্শনের সময় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, সন্তানদের শিক্ষা ও জীবনযাপনের নানা সমস্যার কথা শোনেন জেলা প্রশাসক। তিনি তখন স্থায়ী আবাসন, আত্মকর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন শুরু হলো খাসজমি বরাদ্দ, ২৫ নারীর হাতে সেলাই মেশিন এবং পল্লীর উন্নয়নে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর রূপনগর বেদে পল্লীর পরিবারগুলোর স্বপ্ন এখন শুধু একটি ঘর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থায়ী ঠিকানা, পরিবারের নারীদের হাতে কাজ এবং সন্তানদের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ—এই তিন প্রত্যাশা ঘিরেই নতুন করে পথচলার স্বপ্ন দেখছেন তারা।