দেশে উৎপাদিত ইলিশসহ রুই, কাতলা, আইড় ও বোয়ালের মতো দেশীয় প্রজাতির মাছ আমদানি না করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফায় চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি৷
সম্প্রতি নানা নথি এবং মৎস ও প্রানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন দায়িত্বশীলসূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে৷
জানা গেছে,"গত ১২ অক্টোবর ২০২৫ মৎস্য অধিদপ্তরের এফআইকিউসি শাখা হতে উত্থাপিত এবং তৎকালীন ডিজি আ: রউফ কতৃক স্বাক্ষরিতমন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে দেশীয় মাছের আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন ১৮ দশমিক ৬০ লাখ মেট্রিক টন, যা মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৩৭ দশমিক ০৬ শতাংশ। একই সময়ে মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ দশমিক ৮০ গ্রাম বেড়ে ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রামে উন্নীত হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৯০ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত বলেও এতে বলা হয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের ওই চিঠিতে বলা হয়, ভারত, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে রুই, কাতলা, ভেটকি, বোয়াল, আইড়, কাঁচকি ও অন্যান্য প্রজাতির হিমায়িত বা চিল্ড মাছ দেশে আমদানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে ইলিশও অতীতে আমদানির অনুমতি পেয়েছে। আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪ অনুযায়ী রুই, কাতলা, আইড়, বোয়ালসহ এসব প্রজাতির মাছ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। তবে এসব মাছ ঢালাওভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষ ও মৎস্য খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং জিআই পণ্য। তাই ইলিশ আমদানির সুযোগ না দিয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশে এর আহরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া আমদানি করা মাছে ফরমালিন, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক, রঞ্জক পদার্থ, প্রিজারভেটিভ, হিস্টামিনসহ ক্ষতিকর উপাদান থাকার সম্ভাবনা খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। দেশে সহজলভ্য দেশীয় প্রজাতির মাছ আমদানি না করা অথবা আমদানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তিন মাসের বেশি ফাইলবন্দি চিঠি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মৎস্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি পাঠানোর পর প্রায় তিন মাসের বেশি সময় পর, ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন মৎস্য সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের অতিরিক্ত সচিব (মৎস্য)-কে চিঠিটি মার্ক করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেন। তবে এরপরও বিষয়টি নিয়ে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। এর মধ্যে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আবারও ইলিশের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে ওই চিঠিও এখন পর্যন্ত অগ্রসর হয়নি বলে জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইলিশ আমদানির প্রবণতা নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চল দিয়ে ২ হাজার ১১৮ দশমিক ৮৮ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি হয় ৭২৩ দশমিক ৮২৫ মেট্রিক টন এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ২৭৯ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইলিশ আমদানির পরিমাণ বেড়ে ৮ হাজার ১২৫ দশমিক ৬১৭ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে এ বাবদ ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮২ দশমিক ৩২ মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া খুলনার বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েও বিভিন্ন অর্থবছরে গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৬৬ মেট্রিক টন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৬৫ মেট্রিক টন এবং চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি কমলেও দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইলিশ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৪৩১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়। তবে প্রকল্পটির অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, প্রকল্পে কী কী অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, কোন প্রক্রিয়ায় ইলিশ প্রকল্পের অর্থ বেহাত হয়েছে—এসব বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান করলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে।’
ড. মো. খালেদ কনক বলেন, বাজারে ইলিশের দাম অন্যায্যভাবে বেড়ে গেলে প্রতি বছরই পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সীমিত পরিমাণে ইলিশ আমদানি করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়।তবে আমদানি নির্ভরতা কমানো না গেলে দেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘এত সম্ভাবনাময় একটি খাত অব্যবস্থাপনার কারণে বেহাত হয়ে যেতে পারে। ফলে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
আমদানি নিষেধাজ্ঞায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি
ইলিশসহ দেশীয় মাছ আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধির বিষয়টিও সামনে আসছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেডের (GATT) আর্টিকেল ১১-তে শুল্ক, কর বা অন্যান্য চার্জ ছাড়া আমদানি-রপ্তানির ওপর পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে বিধান রয়েছে। কোটা, আমদানি বা রপ্তানি লাইসেন্স কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত। ফলে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি, দেশের আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়।
ওয়ার্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের নিয়ম অনুযায়ী- কোনো চুক্তিভুক্ত পক্ষ অন্য কোনো চুক্তিভুক্ত পক্ষের ভূখণ্ড থেকে কোনো পণ্যের আমদানির ওপর, কিংবা অন্য কোনো চুক্তিভুক্ত পক্ষের ভূখণ্ডের উদ্দেশ্যে কোনো পণ্য রপ্তানি বা রপ্তানির জন্য বিক্রয়ের ওপর শুল্ক (duties), কর (taxes) বা অন্যান্য চার্জ ব্যতীত অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ আরোপ বা বহাল রাখতে পারবে না । এই বিধিনিষেধ কোটা (quotas), আমদানি বা রপ্তানি লাইসেন্স কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যকর করা হোক না কেন, তা নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, দেশে যে মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, বিশেষ সংকট না থাকলে সেসব মাছ বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখেন না।
তিনি বলেন, ‘এর পাশাপাশি দেশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, সে ধরনের পরিকল্পনা নিতে হবে।’
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে ইলিশের সরবরাহ, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, জেলেদের জীবিকা এবং মৎস্যসম্পদের ভারসাম্য - সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আমদানি নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নদী ও জলজ পরিবেশ সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জেলেদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।