মবিনুল ইসলাম রাশা,গবি:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণবস্তু ঠিক কোথায় বাস করে? বহুতল ভবনের চকচকে ইটে, দৃষ্টিনন্দন মূল ফটকে, নাকি নতুন জ্ঞান তৈরির ল্যাবে? প্রতি বছর যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জাতীয় পর্যায়ের বাজেট চূড়ান্ত হয়, তখন এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দৃশ্যমান অবকাঠামোর প্রতি আমাদের যে প্রবল মোহ, গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ততটা মোহ নেই। একটা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিনন্দন নান্দনিক সব ভবনের কংক্রিট জঙ্গল হিসেবে পরিচিতি পাবে, নাকি মুক্ত চিন্তার, নতুন নতুন গবেষণার কারখানা হবে—তা নির্ভর করে তার বাজেট বরাদ্দের সুচিন্তার ওপর।
আমাদের দেশে বাজেট বরাদ্দ মানেই যেন 'কনক্রিট আর রডের হিসাব'। নতুন একটি পাঁচতলা বা দশতলা হল নির্মাণ, প্রশাসনিক ভবনের আধুনিকায়ন কিংবা ক্যাম্পাসের বাহ্যিক সৌন্দর্যায়ন—এগুলো বাজেট বক্তৃতায় বা বার্ষিক প্রতিবেদনে খুব দ্রুত দৃশ্যমান করা যায়। এতে উদ্বোধনের ফিতা কাটা যায়, দৃশ্যমান উন্নয়নের ক্রেডিট নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবে ৩ বছর ধরে চলা ক্যান্সার গবেষণার অগ্রগতি কিংবা একটি নতুন কোনো তত্ত্বকে চাইলেই ফিতা কেটে উদযাপন করা যায় না। আর এই ক্রেডিটের কিংবা ছবির রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফাদেই বন্দি হয়ে আছে আমাদের শিক্ষা বাজেট।
অথচ সাধারন অর্থনীতির চোখ দিয়ে দেখলেও বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এটি চূড়ান্ত অদূরদর্শীতার এক উদাহরণ। একটি ভবন তৈরি হলে তার পেছনে প্রতি বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়ে, কিন্তু তা থেকে নতুন কোনো আর্থিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্য পাওয় যায় না। অন্যদিকে, গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া প্রতিটি টাকা কাজ করে চক্রবৃদ্ধি সুদের মতো। গবেষণা থেকে নতুন প্রযুক্তি তৈরি হয়, নীতি-নির্ধারণের পথ খোলে, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বা পেটেন্ট তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।
ইউনেস্কোর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, একটি দেশের জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ কিংবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। অথচ আমাদের শিক্ষা বাজেট দুই শতাংশের আশেপাশের কোটাতে আটকে থাকে। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই সামান্য বরাদ্দের সিংহভাগ আবার চলে যায় বেতন-ভাতা আর ইট-পাথরের নতুন ভবন নির্মাণ, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, গবেষণার ভাগ্যে জোটে মোট বরাদ্দের মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে যখন মানসম্পন্ন রিএজেন্ট কেনা বা আধুনিক যন্ত্রপাতি আনার টাকা থাকে না, অথচ পাশের মাঠেই কোটি টাকা খরচ করে নতুন বহুতল ভবনের পাইলিং চলে—তখন বুঝতে বাকি থাকে না, আমাদের উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হারিয়ে গেছে।
আমরা প্রায়ই 'মেধা পাচার' বা ব্রেইন ড্রেন নিয়ে আক্ষেপ করি। কিন্তু একজন তরুণ গবেষক যখন দেখেন তার মেধা প্রমাণের কোনো সুযোগ দেশে নেই, বিশ্বমানের তো দূর—মৌলিক গবেষণার জন্যই তাকে ফান্ড পেতে চাটুকারিতা করতে হচ্ছে, তখন তার সামনে দেশ ছাড়ার আর কোনো বিকল্প থাকে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে দালানকোঠা বানানোর পর যদি ভেতরের মেধাগুলোই হারিয়ে যায়, তবে সেই খালি ভবনগুলো আসলে কিসের প্রতীক? তা কেবল জ্ঞানহীন এক-একটি খোলস বৈ কিছু নয়।
উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে এই অগ্রাধিকারের পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হয়। তাদের কাছে অবকাঠামো মানে শত শত বহুতল ভবন নয়; তাদের অবকাঠামো হলো উচ্চগতির ডিজিটাল ডেটাবেজ এক্সেস, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব, বিশ্বের নামকরা গবেষকদের নিয়ে আসার ফেলোশিপ ফান্ড এবং নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার পরিবেশ। তারা গবেষণা দিয়ে বিশ্ব র্যাংকিং পার করে, আর আমরা ভবনের সংখ্যা গুনে মনের আনন্দ খুঁজি।
অবশ্য অবকাঠামোর প্রয়োজনকে আমি একদম উড়িয়ে দিচ্ছি না। একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কার্যকর ক্লাসরুম, ল্যাব এবং শিক্ষার্থীদের বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা বোকামি। কিন্তু অবকাঠামো হওয়া উচিত গবেষণার ‘সহায়ক মাধ্যম’, মূল লক্ষ্য নয়। আমাদের এখন দরকার 'রিসার্চ-ফার্স্ট' অবকাঠামো নীতি। আগে দেখতে হবে ল্যাবে কী সরঞ্জাম দরকার, বিজ্ঞানীদের কাজের পরিবেশ আছে কি না; তারপর ঠিক হবে সেই ল্যাব রাখার জন্য ভবনের প্রয়োজন কতটুকু।
যে দেশ তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাজেটে গবেষণার চেয়ে ঠিকাদারি উন্নয়নকে বেশি প্রাধান্য দেয়, সেই দেশ বিশ্বমঞ্চে সস্তা শ্রমের যোগানদার হতে পারে, কিন্তু কখনো জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না। ভবনের স্থায়িত্ব শত বছর হতে পারে, কিন্তু সেই ভবনের ভেতরে যদি নতুন জ্ঞান তৈরি না হয়, তবে ইতিহাস তাকে কেবল 'ইটের স্তূপ' হিসেবেই মনে রাখবে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে—আমরা কি ইট-পাথরের মিস্ত্রি হব, নাকি আগামী দিনের উদ্ভাবক তৈরি করব?