বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদিয়া আমৃত খান।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন আর শুধু পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের টিকে থাকার জন্যও এটি অপরিহার্য। বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে পরিবেশ ও কার্বনসংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং এর যথাযথ তথ্যপ্রমাণ রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অডিটরিয়ামে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (এমপিপি) থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রযোজ্য ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ গণশুনানির আয়োজন করে।
গণশুনানিতে বিদিয়া আমৃত খান বলেন, ‘আমি নিজে একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নই এবং বিজিএমইএ কোনো বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ সংস্থাও নয়। কিন্তু পোশাক শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপরিহার্য। বর্তমানে রিনিউয়েবল এনার্জি একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই আমরা এই শুনানিতে অংশ নিয়েছি।’
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন আর কোনো পছন্দের বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।
বিদিয়া আমৃত খান উল্লেখ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন কঠোর পরিবেশগত ও করপোরেট জবাবদিহি-সংক্রান্ত বিধিবিধান বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। CSDDD, CSRD, ESRS এবং ESPR-এর মতো নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতা রপ্তানিকারকদের তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রতিটি রপ্তানিযোগ্য পোশাকে কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করার সুযোগ থাকবে। ওই কোড স্ক্যান করে ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত সুতার উৎস, উৎপাদনে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হয়েছে এবং কতটুকু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে—এসব তথ্য জানতে পারবেন।
‘এই শর্তগুলো আমরা পূরণ করতে না পারলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা থাকবে না’, বলেন তিনি।
বিজিএমইএর এই ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মাত্র ১ দশমিক ৯০ শতাংশ। অথচ প্রতিযোগী দেশগুলো এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে রয়েছে। ভিয়েতনামে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ৪৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ, কম্বোডিয়ায় ৪০ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ভারতে ১৯ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আমাদের প্রতিযোগীরা যদি এত এগিয়ে থাকতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?’
এ সময় দেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান ব্যয় পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিদিয়া আমৃত খান বলেন, গত এক বছরে কাস্টমস চার্জ প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস, পেট্রোল এবং শ্রমিকদের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন ব্যয়ও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের মতো সরঞ্জাম আমদানিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ যখন শিল্প খাতে জ্বালানি সহায়তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করার কথা বলছে, তখন এনবিআরের পক্ষ থেকে কর বাড়িয়ে দেওয়া নীতিগতভাবে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিদিয়া আমৃত খান আরও বলেন, বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং তার প্রমাণ দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি কমতে থাকবে। একসময় দেশের প্রধান এই শিল্পই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
বিজিএমইএর এই প্রতিনিধি বলেন, পোশাক শিল্পের সবুজ রূপান্তর শুধু শিল্প মালিকদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তা, সঠিক ট্যারিফ কাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের আমদানি সহজ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
গণশুনানিতে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নীতিগত বাধা দূর করার পাশাপাশি শিল্প খাতে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিদিয়া আমৃত খানের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে একদিকে যেমন জলবায়ু ও পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করা কঠিন হবে, অন্যদিকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।